
মহিদুল ইসলাম (শাহীন) খুলনা।
ফারাক্কার প্রভাবে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট খুলনা সুন্দরবনকে ঘিরে রাখা ৫৩ নদী নাব্যতা হারিয়ে মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে । দু’দেশের পানি চুক্তি আছে, কিন্তু বণ্টন নীতিতে রয়েছে ফারাক। ফলে সুন্দরবন উপকূল নদ-নদীর জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব রয়েছে চরম সংকটে। ফারাক্কা ও অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনার অভাবে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নদীর নাব্যতা আজ বিপন্ন।সুন্দরবনসহ খুলনার যে নদীগুলো নাব্যতা হারিয়েছে, তার প্রধান কারণ ফারাক্কা বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল। আর নাব্যতা হারানো অধিকাংশ নদীই সুন্দরবন বেষ্টিত খুলনাঞ্চলে বেশি। দেশে মোট নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি। খুলনা বিভাগে নদ-নদীর সংখ্যা ১৩৮ টি। দখলদারদের লোভের শিকারে খুলনা বিভাগের ৩৭ টি নদীসহ সুন্দরবন সংলগ্ন মোট ৫৩ টি নদী সংকটাপন্ন (মৃত্যু পুরীতে পরিনত হয়েছে)।এরমধ্যে ২৭ টি নদী প্রবাহমান নেই, নয়টি নদী আংশিক প্রবাহমান রয়েছে। বাকিগুলো স্রোত না থাকায় ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। এ কান্নার যেন দেখার কেউ নেই। শিবসা ও কপোতাক্ষ নদীকে বলা হয় সুন্দরবনের অক্সিজেন। এরাই এখন নাব্যতা সংকটে ভুগছে। এছাড়া নাব্যতা সংকটে থাকা খুলনার অন্য নদীগুলো হলো- গড়খালি, নৈরকোন, সৈয়দখালি, হরিণখোলা,হরি, হাড়িয়া,হাবরখালি,নোয়াই, পশুর,পুরাতন পশুর,বাতাঙ্গি, বাদুরগাছা,বানিয়াখালি, বিগরদানা,ভদ্রা নদী, মঙ্গা, মধুখালি, ময়ূর, মরাভদ্রা,মিনহাজ,মির্জাপুর,রাধানগর, লতা,পুতলাখালি,গাছুয়া, গুনাখালি,গেউবুনিয়া, গোয়াচাবা,ঘোষখালি, ঘ্যাংরাই,চাঁদখালি,চিত্রা, চুনকুড়ি, জিরবুনিয়া, ঝপঝপিয়া, ঢাকি, তালতলা, তেলিখালি, দিঘলিয়া, দেলু, শাকবাড়িয়া, শামুকপোতা, শোলমারি,সালতা,উত্তর কাঠামারি,কয়রা,নালুয়া, কাটাবুনিয়া,কালিনগর, কিচিমিচি,কুরুলিয়া,জিলে ও চকরিবকরি।সুন্দরবন হচ্ছে দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের রক্ষা কবচ। টর্নেডো, ঘুর্ণিঝড় কিংবা সাইক্লোনের ছোবল থেকে এই সুন্দরবন বুক পেতে দিয়ে আগলে রাখে গোটা অঞ্চলকে। উপকূলের কোটি-কোটি মানুষকে নিরাপদ রাখতে ও তাদের জীবিকা নির্বাহে সুন্দরবনের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। অথচ বছরের পর বছর সেই সুন্দরবনই ভালো নেই। নদীগুলো অপশাসনের কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নদী-খালগুলো ভরাট হয়ে যেতে শুরু করেছে।পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া এ সকল নদী ও খালে জোয়ারের পানি ঢুকছে না, ভাটার সময় পানি নামছে না। ফলে বনের ভেতরে লবনাক্ততা বেড়েই চলেছে। যা সুন্দরবনের প্রাণী ও জীববৈচিত্রের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মাঝে মধ্যেই সুন্দরবনের হরিণ,বাঘসহ বিভিন্ন প্রাণী খাদ্য ও পানির জন্য লোকালয়ে প্রবেশ করছে। ইদানিং এ সংখ্যা বেড়ে গেছে।ভারতের আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির ফলশ্রুতিতে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে খুলনা অঞ্চলের নদীগুলোর প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন পানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের নদীতে পানি আসে গঙ্গা অববাহিকা থেকে। ফারাক্কায় যে শুভংকরের ফাঁকির স্রোত বহমান সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগন্য। সময় মতো তাই এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলো পানি পায়না। যা এ অঞ্চলের
নদ-নদীগুলোর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া উজান থেকে যে পানি আসে, সেটা গড়াই দিয়ে ঢোকে। সেই গড়াইয়ের মুখেও বাধা আছে। দু’দেশের মধ্যে পানির হিস্যা নিয়ে যে বন্টকনামা রয়েছে তার বাস্তবে কোন প্রয়োগ নেই। ফলে নদ-নদীগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ছে দিনের পর দিন। আরেক নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীও ফারাক্কাকে দায়ী করেছেন।তিনি বলেন, গঙ্গাই হচ্ছে খুলনাঞ্চলের নদীগুলোর পানির উৎস্য। পদ্মা থেকে পানি নিয়ে মাথাভাঙ্গা,শিয়ালমারি, হিসনা,গড়াই, চন্দনা ও ভৈরব নদ-নদী প্রবাহিত হয়। পদ্মায় যদি স্রোত থাকে তাহলে সেখান থেকে পানি গড়িয়ে এ নদীগুলোতে যায়। পরে সেটি বিভিন্ন নদী হয়ে সুন্দরব অঞ্চলের নদীগুলোতে মেশে। বর্তমানে পদ্মাতেই পানি কম। ফারাক্কার কারণে পদ্মাসহ এসকল নদ নদী নাব্য হারাবে,সেটাই স্বাভাবিক।অপরদিকে,খুলনা জেলা সদর থেকে খোদ দক্ষিণে আগে নদীপথে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল। নাব্য সংকটে সেটি আর নেই।এছাড়া নদী নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী যারা ছিল, তারা পেশা হারিয়েছে। পাশাপাশি নদীগুলো মাছের প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যা এখন আর নেই। আবার মাছের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন প্রাণী যেমন পাখি, ভোদড়, শুশুক কমে গেছে। অথচ ২৪ ঘণ্টায় ছয় বার প্রাকৃতিক রূপ বদলানো সুন্দরবনের মোট আয়তনের ৫২ ভাগই এখন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ। তাছাড়া মৎস্য প্রজনন ও অভয়ারণ্য বলে খ্যাত ভদ্রায় এখন মাছের প্রজনন রীতিমতো শুন্যের কোঠায়।সার্বিক বিষয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স কল্যাণ পরিষদে সাধারণ সম্পাদক ও এস্টেট শাখার প্রধান এস এম মোহাম্মদ আলী বলেন, নৌযানে জৈব-জ্বালানীর পরিবর্তে রুপান্তরিত গ্যাসে বাধ্যতামুলক করা যেতে পারে। নাব্যতা রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। মৃত্যু ও ভরাট নদীগুলো ড্রেজিং করে পুনরায় সচল করতে হবে। তবেই নদীর নাব্যতা ফিরে আসবে।।