
পিরোজপুর প্রতিনিধি:
পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ, মাস্টার্স ও অনার্স ডিগ্রিধারী। সংবাদটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক পক্ষ বলছেন, এটি একটি শতভাগ স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগের উদাহরণ। অন্য পক্ষের প্রশ্ন—এত উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অফিস সহায়কের মতো একটি পদে নিয়োগ পাওয়া কি সত্যিই আনন্দের সংবাদ, নাকি এটি দেশের চাকরির বাজারের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি?নিঃসন্দেহে মেধাভিত্তিক নিয়োগের বিকল্প নেই। নিয়োগে ঘুষ, তদবির কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয়। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, একটি নিয়োগের সাফল্য শুধু প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায় নয়; সেই নিয়োগ রাষ্ট্রের মানবসম্পদকে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।অফিস সহায়ক সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন স্তরের একটি পদ। একসময় যার নাম ছিল এমএলএসএস। ফাইল বহন, নথিপত্র পৌঁছে দেওয়া, অফিস পরিচ্ছন্নতা, অতিথি আপ্যায়নসহ বিভিন্ন সহায়ক কাজই এই পদের মূল দায়িত্ব। কোনো কাজই ছোট নয়, শ্রমের মর্যাদা সর্বত্র সমান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ বা মাস্টার্স ডিগ্রিধারীকে কি রাষ্ট্র এই কাজের জন্যই দীর্ঘদিন শিক্ষা দিয়েছে? একজন উচ্চদক্ষ জনশক্তিকে তার দক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা কি মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার?আরও একটি বাস্তব বিষয় রয়েছে। অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত তরুণ এই চাকরিকে চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখবেন না। তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী আরও ভালো চাকরির চেষ্টা করবেন। সুযোগ পেলেই তারা বর্তমান কর্মস্থল ছেড়ে চলে যাবেন। তখন পদ শূন্য হবে, আবার নিয়োগ দিতে হবে, আবার প্রশিক্ষণ দিতে হবে, আবার প্রশাসনিক ব্যয় বাড়বে। অর্থাৎ এই নিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা দেয় না।অন্যদিকে, এসএসসি বা এইচএসসি পাস করার পর আর পড়াশোনার সুযোগ পাননি—এমন অসংখ্য তরুণের জন্য অফিস সহায়কের মতো পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল। আজ সেই সুযোগও উচ্চশিক্ষিতদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে সমাজের একটি বড় অংশ, যাদের জন্য এ ধরনের পদ সবচেয়ে উপযোগী, তারা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ও রয়েছে, যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। বাংলাদেশে এমন বহু সরকারি পদ রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা আবেদনই করতে পারেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন পদে সাধারণভাবে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের আবেদন করার সুযোগ থাকে না। এর উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট পর্যায়ের প্রার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং জনবল কাঠামোর ভারসাম্য বজায় রাখা। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—অফিস সহায়কের মতো কিছু পদের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের নীতিগত চিন্তা করা উচিত নয়? অন্তত এই বিতর্কটি হওয়া প্রয়োজন।এই ঘটনা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। প্রতিবছর হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বের হচ্ছেন। কিন্তু তাদের দক্ষতার উপযোগী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে উচ্চশিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতার পরিবর্তে কেবল একটি সনদে পরিণত হচ্ছে। একজন তরুণ যখন চার-পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত অফিস সহায়ক পদে আবেদন করতে বাধ্য হন, তখন প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তির নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনারও।অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, কোনো দেশের উন্নয়ন শুধু শিক্ষার হার দিয়ে নয়, বরং সেই শিক্ষা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা দিয়েও মূল্যায়ন করা হয়। একজন ইঞ্জিনিয়ার যদি ইঞ্জিনিয়ারের কাজ না করেন, একজন কৃষিবিদ যদি কৃষি নিয়ে কাজ না করেন, একজন অর্থনীতিবিদ যদি তার জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ না পান, তাহলে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে।আরেকটি বিষয়ও উল্লেখ করা জরুরি। এখন প্রায়ই শোনা যায়—‘তদবির ছাড়া চাকরি হয়েছে’, ‘এক টাকাও ঘুষ লাগেনি’, ‘চাপমুক্ত নিয়োগ হয়েছে’। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক সংবাদ। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে প্রশ্ন জাগে—এগুলো কি আলাদা করে বলার বিষয় হওয়া উচিত? স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও মেধাভিত্তিক নিয়োগই তো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। যখন স্বাভাবিক বিষয়টি বিশেষ অর্জন হিসেবে প্রচার করতে হয়, তখন বুঝতে হবে অতীতে অনিয়ম আমাদের প্রত্যাশার মানদণ্ডকেই নিচে নামিয়ে দিয়েছে।পাবনার এই নিয়োগ তাই কেবল একটি জেলার সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন স্বচ্ছ নিয়োগের ইতিবাচক বার্তা রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিক্ষিত বেকারত্ব, অতিরিক্ত যোগ্যতার অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, মানবসম্পদের অপচয় এবং নিয়োগনীতির সীমাবদ্ধতার কঠিন বাস্তবতা।স্বচ্ছ নিয়োগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু রাষ্ট্রের সাফল্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন একজন ইঞ্জিনিয়ারকে অফিস সহায়ক হতে হবে না, আবার একজন এসএসসি বা এইচএসসি পাস তরুণও তার উপযোগী চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং মানুষের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে একটি সুষম ও কার্যকর সংযোগ তৈরি করা। সেই সংযোগ প্রতিষ্ঠা করাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।লেখকঃ মোঃ মিজানুর রহমান,শাখা ব্যবস্থাপক,রুপালি ব্যাংক পিএলসি,কর্পোরেট শাখা,পিরোজপুর।।