1. admin@banglarchetona.com : admin :
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
দিঘলিয়ার হাজীগ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ দিনাজপুরে র‌্যাবের অভিযানে ৩৩ হাজার বোতল যৌন উত্তেজক সিরাপসহ গ্রেফতার ৩ জন। মাচায় পোল্লার বাম্পার ফলন: ডুমুরিয়ার শাহিনুরের সাফল্যে কৃষকদের মাঝে নতুন আশা *সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে ৫৯৪ বোতল উইনকেরেক্সসহ একজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব-৬ সিপিসি-১সাতক্ষীরা* দিঘলিয়ায় শিক্ষাথীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে প্রধান শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠান দিঘলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ খুলনা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত হরিভদ্রা নদী খননেও মিলছে না সুফল: ডুমুরিয়ায় পলি অপসারণের দাবিতে ইউএনও-র কাছে গণআবেদন র‍্যাব-৬,যশোর শার্শায় পৃথক ২ অভিযানে ২৬৯ বোতল উইনকেরেক্স এবং ৭৪৪ বোতল স্কাফসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে ফুলবাড়ীতে ছিনতাইয়কারীর ছুরির আঘাতে চালক নিহত;গাড়িসহ ঘাতক ছিনতাইকারী আটক ১ “বাংলাদেশে প্রথম ইসলাম প্রচার হয় যে মসজিদ থেকে”

আমলাতন্ত্রের আধিপত্য নাকি সুশাসন: প্রশাসনিক সংস্কার এখন সময়ের দাবী”-মিজানুর রহমান

বাংলার চেতনা ডেস্ক :
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ৭৯ বার পঠিত

পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি

একটি রাষ্ট্র কখনো একজন ব্যক্তি, একটি দপ্তর কিংবা একটি ক্যাডারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে, যেখানে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব, ক্ষমতা ও জবাবদিহি থাকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ধারণা হলো Checks and Balances বা ক্ষমতার ভারসাম্য। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানই যেন এতটা শক্তিশালী না হয়ে ওঠে যে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত তার অধীনস্থ হয়ে পড়ে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলেই জন্ম নেয় প্রশাসনিক আধিপত্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
বাংলাদেশে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়েছিল। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রকৃত অর্থে কি বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন? বিচারকদের নিয়োগ, আদালতের অবকাঠামো, জনবল, বাজেট এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনও নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীলতার আলোচনা আইনজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে পৃথকীকরণ ঘটলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পথ এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
একই চিত্র প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাতে এমনভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু সমন্বয়কারী নন; কার্যত অধিকাংশ বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সমাজসেবা, প্রকৌশল, স্থানীয় সরকার, ভূমি, ত্রাণ, পরিবেশ—প্রায় প্রতিটি খাতের অসংখ্য কমিটির সভাপতির দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত। প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা কি এত বৈচিত্র্যময় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের চেয়ে অধিকতর দক্ষ হতে পারেন?
এর ফলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পেশাগত নেতৃত্ব অনেক সময় গুরুত্ব হারায়। একজন সিভিল সার্জন স্বাস্থ্য সম্পর্কে, একজন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শিক্ষা সম্পর্কে, একজন নির্বাহী প্রকৌশলী অবকাঠামো সম্পর্কে, একজন কৃষি কর্মকর্তা কৃষি সম্পর্কে অধিকতর বিশেষজ্ঞ। কিন্তু যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের শেষ কথা প্রশাসনই হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞ মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আরও একটি বাস্তবতা হলো আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের অনুভূতি। এমন ঘটনাও দেখা যায়, যেখানে তৃতীয় বা চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তাকেও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে পঞ্চম বা ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অবশ্যই থাকতে হবে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা কখনোই পারস্পরিক সম্মান ও পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে না।
সাম্প্রতিক সময়ে এক প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে একজন ইউএনওর আচরণ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিচার অবশ্যই তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। তবে এই ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে—মাঠ প্রশাসনের হাতে কি অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে? যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে অতিরিক্ত কর্তৃত্ব জমা হয়, তখন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
একই সমস্যা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতেও বিদ্যমান। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের জনপ্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। কিন্তু বাস্তবে উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক অনুমোদন কিংবা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তাদের মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন জনপ্রতিনিধিরা, অথচ কার্যকর প্রশাসনিক ক্ষমতার একটি বড় অংশ থেকে যায় আমলাতন্ত্রের হাতে। এতে স্থানীয় সরকার দুর্বল হয় এবং গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য ব্যাহত হয়।
এই প্রবণতার আরেকটি রূপ হলো ডেপুটেশন সংস্কৃতি। রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট পেশাগত ক্যাডারের পরিবর্তে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ডেপুটেশনে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রশাসনিক যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না, বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়, পদোন্নতির প্রেরণা কমে এবং একটি ক্যাডারের অতিরিক্ত প্রভাব অন্য ক্যাডারগুলোর মধ্যে বৈষম্য ও হতাশার জন্ম দেয়।
ব্যাংকিং খাতেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পদোন্নতির ভাইভা বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এতে এক ধরনের দ্বৈত কর্তৃত্বের পরিস্থিতি তৈরি হয়। একজন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম), যিনি চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা, তার পদোন্নতির বোর্ডে কখনও পঞ্চম গ্রেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তাও সদস্য থাকেন। আইনগতভাবে এটি বৈধ হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন বিশেষায়িত ব্যাংকিং কর্মকর্তার পেশাগত মূল্যায়ন কি মূলত ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের হাতেই হওয়া উচিত নয়?
বিশ্বের উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় Specialization বা বিশেষায়িত নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য খাত পরিচালনা করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষা খাত শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, আর্থিক খাত আর্থিক বিশেষজ্ঞ, বিচার পরিচালনা করেন বিচারক, আর প্রশাসনের প্রধান ভূমিকা থাকে সমন্বয়, নীতি বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কোনো একটি ক্যাডার সব প্রতিষ্ঠানের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে না।
বাংলাদেশেও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গঠনমূলক আলোচনা জরুরি। জেলা প্রশাসকের পদে যুগ্ম সচিব এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদে উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়নের বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে পদমর্যাদা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের মধ্যে অধিকতর সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রকৌশল, ব্যাংকিং ও স্থানীয় সরকার–সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর নেতৃত্ব সংশ্লিষ্ট পেশাগত বিভাগের প্রধানদের হাতে দেওয়া উচিত। প্রশাসনের মূল ভূমিকা হবে সমন্বয় করা, প্রতিটি খাতের একক নিয়ন্ত্রক হওয়া নয়।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কেউ কারও প্রভু নন। ডিসি, ইউএনও, বিচারক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, ব্যাংকার কিংবা জনপ্রতিনিধি—সকলেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং জনগণের সেবক। রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়; যখন ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বণ্টিত হয়; যখন বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞই করেন এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার সাংবিধানিক মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে পারে।
সুশাসনের ভিত্তি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে নয়, ক্ষমতার ভারসাম্যে। আর সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হতে পারে আগামী দিনের প্রশাসনিক সংস্কারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সবচেয়ে জরুরি জাতীয় প্রয়োজন।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ বাংলার চেতনা
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park