মহিদুল ইসলাম (শাহীন) খুলনা থেকে,
কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়,এটি দেশের অর্থনীতি,খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। হাজার বছরের কৃষি ভিত্তিক এই জনপদে ধান শুধু একটি ফসল নয়,বরং মানুষের জীবন-সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে আছে। দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনো ভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সেই কৃষির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ধান। তবে বর্তমান সময়ে কৃষিতে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে,হাওরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা ফসলের ক্ষতি করছে,পাহাড়ি এলাকায় ঢল ও মাটিক্ষয় কৃষিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে,আবার উত্তরাঞ্চলে খরার প্রভাব ধান উৎপাদনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। স্থানীয় এসব বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-তে বাস্তবায়িত হচ্ছে “নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি)” শীর্ষক প্রকল্প। একই সাথে, প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ১৫ টি প্রযুক্তি গ্রাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, যান্ত্রিকী করণ ও উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা কৌশলের সমন্বিত প্রদর্শন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম কৃষি উন্নয়নে একটি নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের চ্যালেঞ্জ সমূহকে বিবেচনায় নিয়ে এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন,খুলনা এর আওয়তায় বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারভাঙ্গা গ্রামে ১০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে একটি প্রযুক্তি গ্রাম। যেখানে আধুনিক ধান চাষ,সুষম সার ব্যবস্থাপনা,দক্ষ পানি ব্যবহার, রোগবালাই দমন ও কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার হাতে-কলমে প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষকের চাহিদা ভিত্তিক মাঠ গবেষণার মাধ্যমে বাস্তব সম্মত ও সম্প্রসারণ যোগ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হচ্ছে। প্রযুক্তি গ্রামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ব্যতিক্রমধর্মী “রাইস গার্ডেন”। এখানে ব্রি উদ্ভাবিত ও অবমুক্তকৃত বোরো মওসুম উপযোগী মোট ৬১টি ধানের এর মধ্যে রয়েছে ৫৮ টি জাত একই মাঠে প্রদর্শন করা হয়েছে। রাইস গার্ডেনে উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান১০০, ১০২, ১০৮, ১১৬ ও ১১৮-এর পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য উপযোগী লবণ সহিষ্ণু ব্রি ধান৬৭, ৯৭ ও ৯৯ প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে বাসমতি টাইপের সুগন্ধি ব্রি ধান১০৪, লো-জিআই সম্পন্ন ডায়াবেটিক রাইস ব্রি ধান১০৫ এবং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী ব্রি ধান১১৪। কৃষকরা একই মাঠে এসব জাতের বৃদ্ধি, ফলন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং পরিবেশ উপযোগিতা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রি ধান-৬৭ ও ব্রি ধান-৯৯ দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত পরিবেশে চাষাবাদের জন্য আশাব্যঞ্জক জাত। অন্যদিকে ব্রি ধান-১০৫ স্বাস্থ্যসচেতন ও ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ধান হিসেবে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের ব্রি ধান-১০৪ দেশের উচ্চমূল্যের চালের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।এছাড়া ব্রি ধান-১০০ ও ব্রি ধান-১০২ উচ্চ জিংক সমৃদ্ধ এবং চিকন চালের জাত হওয়ায় পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। শিশু,কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও এসব জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। বর্তমানে ব্লাস্ট রোগ ধান উৎপাদনের অন্যতম বড় হুমকি। এ প্রেক্ষাপটে ব্লাস্ট প্রতিরোধী ব্রি ধান-১১৪ কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্রি ধান-১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ উচ্চ ফলনশীল ও অধিক উৎপাদন সক্ষম জাত হিসেবে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ঘেরভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ফলাফল প্রদর্শন করছে। মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে,অনুকূল ব্যবস্থাপনায় এ জাত প্রতি শতকে এক মণেরও বেশি ফলন দিতে সক্ষম। প্রযুক্তি গ্রামে শুধু ধানের জাত প্রদর্শনই নয়, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিরও সমন্বিত প্রদর্শনী পরিচালিত হচ্ছে। সুষম সার ব্যবস্থাপনা, দক্ষ পানি ব্যবহার, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং পরিবেশ বান্ধব চাষাবাদ সম্পর্কে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষকের চাহিদা ভিত্তিক মাঠ গবেষণার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ও সম্প্রসারণযোগ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজও চলমান রয়েছে। প্রযুক্তি গ্রামের কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক কৃষক ইতোমধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান-৮, ব্রি ধান-১০৮ এবং ব্রি ধান-১১৪ চাষ করে লাভবান হয়েছেন। স্থানীয় কৃষক দীপ্ত গোলদার জানান, মাত্র পাঁচ কাঠা জমি থেকে তিনি ১০ মণ ৫ কেজি ধান পেয়েছেন।উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় লাভও হয়েছে বেশি। আগামী মৌসুমে তিনি আরও বেশি জমিতে এসব জাতের চাষ করবেন বলে জানান।অন্য কৃষক নারায়ণ বিশ্বাস বলেন,“যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণ ও কর্তনের ফলে শ্রম, সময় এবং উৎপাদন খরচ উল্লেখ যোগ্য ভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।”এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড.মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, “প্রযুক্তি গ্রামের মূল লক্ষ্য হলো গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে দ্রুত কৃষকের মাঠে পৌঁছে দেওয়া। কৃষকরা এখানে বিভিন্ন জাত ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের এলাকার জন্য উপযোগী প্রযুক্তি নির্বাচন করতে পারছেন। গবেষণা,সম্প্রসারণ, জনপ্রিয়করণ ও কৃষকের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করাই এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।”ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন,খুলনার প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.মোঃ সাজ্জাদুর রহমান বলেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিতে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ।এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলায় প্রযুক্তি গ্রামে লবণ সহিষ্ণু, পুষ্টিসমৃদ্ধ, উচ্চফলনশীল ও বিভিন্ন ঘাতসহনশীল ধানের জাত নিয়ে গবেষণা,প্রদর্শনী এবং মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়ন পরিচালিত হচ্ছে। কৃষকরা এখানে শুধু নতুন জাত সম্পর্কে জানছেন না, বরং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা,সুষম সার প্রয়োগ,দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনা এবং যান্ত্রিকীকরণের বাস্তব প্রয়োগও শিখছেন, যা কৃষির ঝুঁকি হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”খুলনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইন বলেন, “প্রযুক্তি গ্রাম শুধু একটি প্রদর্শনী ক্ষেত্র নয়,এটি গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী এবং কৃষকের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। গবেষণার ফলাফল সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় নতুন জাত ও প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয় করণ সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন শীলতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, পরিবেশ বান্ধব কৃষি চর্চার প্রসার এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে।”টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা ও কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রযুক্তি গ্রামে নিয়মিত মাঠ দিবস, কৃষক সমাবেশ, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক ধানের বীজ, সার, কৃষি যন্ত্রপাতি, আধুনিক বালাই ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পর্যন্ত ধান উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। খুলনার বটিয়াঘাটার এই প্রযুক্তি গ্রাম এখন শুধু ধান উৎপাদনের একটি ক্ষেত্র নয়; এটি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, এলএসটিডি প্রকল্পের এ উদ্যোগ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই করে তুলবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক কৃষি উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণ যোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।।
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ নজরুল ইসলাম। খুলনা অফিসঃ ৬/১ পাবলা কেশবলাল রোড, দৌলতপুর, খুলনা। মোবাইলঃ ০১৭১৩৭০৮১৯
Copyright © 2026 বাংলার চেতনা. All rights reserved.