
এস.এম.শামীম,দিঘলিয়া খুলনা।।
এক সময় “সোনালী আঁশ” খ্যাত পাট শিল্পের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল খুলনা অঞ্চল। সরকারি ও বেসরকারি মিল, পাটচাষি, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে এই শিল্প ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ সেই শিল্পাঞ্চল কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।পাটকল বন্ধে অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে ধস বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে থাকা বহু সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয় ২০২০ সালে, যা খুলনাসহ সারা দেশে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর কারণ হয়েছে। শুধু খুলনা অঞ্চলেই ৯টি সরকারি পাটকল বন্ধ হওয়ায় বিশাল শিল্পাঞ্চল অচল হয়ে পড়ে। দেশব্যাপী ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হওয়ায় ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হন।বেসরকারি খাতেও পরিস্থিতি ভালো নয়। কাঁচা পাটের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা হ্রাসের কারণে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে খুলনা অঞ্চলের ২৩টি বেসরকারি পাটকল উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দেয়।ফলে একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ পাট শিল্পের ক্ষেত্রে কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সাগর জুট স্পিনিং মিলস—সংকটের মাঝেও আশার আলো এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি এলাকায় অবস্থিত সাগর জুট স্পিনিং মিলস লিমিটেড হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান অবলম্বন হিসেবে টিকে আছে।১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত সাগর জুট স্পিনিং মিলস একটি শতভাগ রপ্তানিমুখী পাট সুতা ও টুইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববাজারে মানসম্মত পাট সুতা উৎপাদনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে সুপরিচিতি অর্জন করেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে মিলটি নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মিলটি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকদের পাশাপাশি পাটচাষি, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট খাতেও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
সাগর জুট স্পিনিং মিলস শুধু কর্মসংস্থান নয়, দিঘলিয়া ও আশপাশের এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শ্রমিকদের আয়, স্থানীয় বাজারের ব্যবসা, পরিবহন ও আবাসন খাত মিলিয়ে এলাকায় একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি এমন রপ্তানিমুখী পাট শিল্প উদ্যোগগুলোকে সরকারিভাবে উৎসাহ দেওয়া যায়, তবে পাট শিল্পের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব। ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তবে সাগর জুট স্পিনিং মিলসও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।কাঁচা পাটের মূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংকট, বৈদেশিক বাজারের অনিশ্চয়তা ও নীতিগত সহায়তার অভাব এই শিল্পের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত।অন্যদিকে, পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে পাটের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ হলে এই শিল্প আবারও খুলনার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।খুলনার পাট শিল্প যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন দিঘলিয়ার সাগর জুট স্পিনিং মিলস লিমিটেড হাজার হাজার মানুষের জীবিকা ও আশা ধরে রেখেছে। একসময়ের সোনালী আঁশের রাজধানী খুলনার শিল্প ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করতে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোই হতে পারে ভবিষ্যতের ভরসা।।