এস.এম.শামীম দিঘলিয়া, খুলনা।
খুলনা মহানগর ও আশপাশের জেলায় একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর প্রতারণা চক্র দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। ফেসবুক পেইজ, ইউটিউব চ্যানেল ও নামমাত্র অনলাইন প্ল্যাটফর্ম খুলে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ে চাঁদাবাজি—এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে।অল্প খরচে ‘মিডিয়া’, বড় অংকের চাঁদা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েকটি গ্রুপ মাত্র কয়েকশ’ টাকার খরচে ফেসবুক পেইজ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে নাম দেয়—‘অনলাইন টিভি’, ‘লাইভ টিভি’, ‘ডিজিটাল নিউজ’, ‘বাংলা টিভি’ ইত্যাদি। কোনো ধরনের ডিএফপি নিবন্ধন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন কিংবা প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের স্বীকৃতি ছাড়াই তারা নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে।এই পরিচয়ের আড়ালে শুরু হয় ভয় দেখানো। কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা পারিবারিক সমস্যাকে ‘নিউজ’ বানানোর হুমকি দিয়ে হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।টার্গেটে সরকারি দপ্তর: বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস, এলজিইডি, বন বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই এসব ভুয়া সাংবাদিকদের প্রধান টার্গেট। ভুক্তভোগীরা জানান, অজানা নম্বর থেকে ফোন বা মেসেজে ‘নিউজ করবো’, ‘ঢাকা থেকে নির্দেশ এসেছে’—এমন ভাষায় চাপ সৃষ্টি করে মোটা অংকের টাকা দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়। এসব পেইজ ও চ্যানেলের প্রতিনিধিত্ব দেখিয়ে গ্রামীণ এলাকাকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।অনুষ্ঠানে দখলদারি ও বিশৃঙ্খলা: সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা সামাজিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে এসব ভুয়া সাংবাদিকদের উপস্থিতিও দিন দিন বাড়ছে। সামনের সারিতে জায়গা দখল, ক্যামেরা নিয়ে ঠেলাঠেলি, লাইভ করার নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি—এসব ঘটনায় বিব্রত হচ্ছেন পেশাদার সাংবাদিকরা। একাধিক সিনিয়র সাংবাদিক জানান, এতে একদিকে অনুষ্ঠান কাভারেজ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত মান নিয়ে প্রশ্ন: অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনেক ভুয়া সাংবাদিকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাও নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে না পারলেও তারা নিজেদের ‘সিনিয়র রিপোর্টার’, ‘স্টাফ রিপোর্টার’, এমনকি ‘ব্যুরো চিফ’ পরিচয় ব্যবহার করছে। সচেতন মহলের মতে, এই অবস্থা চলতে থাকলে সাংবাদিকতা পেশা একটি হাস্যকর ও ভয়ংকর পরিচয়ে পরিণত হবে।কেন থামছে না ভুয়া সাংবাদিকতা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মিডিয়া খুলতে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই, সাধারণ মানুষ ‘নিউজ’ নাম দেখলেই বিশ্বাস করে, ভুয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া, এই তিনটি কারণেই প্রতারণা বাড়ছে।দাবি ও করণীয়: সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক নেতা ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে—অনুমোদনহীন অনলাইন মিডিয়া ও পেইজের তালিকা প্রকাশ, ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় ফৌজদারি মামলা, সাইবার মনিটরিং জোরদার ও ডিজিটাল নীতিমালা বাস্তবায়ন, সরকারি দপ্তরে অনুমোদিত সাংবাদিকদের তালিকা প্রদর্শন করার জোর দাবি জানিয়েছেন।শেষ কথা: সত্যিকারের সাংবাদিকতা যেখানে জনগণের পক্ষে কথা বলে, সেখানে ভুয়া সাংবাদিকরা সেই পেশার নাম ব্যবহার করে সমাজে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এখনই যদি কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই নীরব প্রতারণা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।।
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ নজরুল ইসলাম। খুলনা অফিসঃ ৬/১ পাবলা কেশবলাল রোড, দৌলতপুর, খুলনা। মোবাইলঃ ০১৭১৩৭০৮১৯
Copyright © 2026 বাংলার চেতনা. All rights reserved.